আসসালামু আলাইকুম,
বাংলাদেশে বহু জাতিগোষ্ঠীর, বহু সমপ্রদায়ের মানুষের বসবাস। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই শ্যামল ভূখণ্ড কেবল বাঙালি জাতি, বাঙালি মুসলমান বা বাঙালি হিন্দু সমপ্রদায়ভুক্ত মানুষরাই বসবাস করে না, এদের পাশাপাশি বসবাস করে নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীও। সাঁওতাল, ওঁরাও, পাহাড়িয়া, মুন্ডা, রাজবংশী, কোঁচ, খাসিয়া, মনিপুরী, টিপরা, গারো, হাজং, মার্মা, চাকমা এরা এ দেশেরই নাগরিক। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এক নয়, প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। একই ভূখণ্ডের বসিন্দা হলেও একটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এটাই হচ্ছে সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
বাংলাদেশে বসবাসরত জনোগোষ্ঠীর চলমান সংস্কৃতিকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি: নগরসংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও আদিম সংস্কৃতি। নগরসংস্কৃতি আধুনিকতার আলোকপ্রাপ্ত, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রভাবিত। নগরসংস্কৃতি স্বরূপে সংস্কারধর্মী এবং সঙ্করধর্মী। এখানকার চাকুরি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ ও মেলামেশার ফলে প্রভাব খুব দ্রুত পড়ে। শিক্ষিত নাগরিকরা সহজেই সংস্কৃতির এসব উপকরণ রপ্ত করে নেয়। নগরসংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ নানা উপাদান রয়েছে। বিজ্ঞানের প্রসাদপুষ্ট নগরবাসীর একটি ঘরের পরিচয় হল: বেডরুম, ড্রয়িংরুম, ডাইনিংরুম, কিচেনরুম, বাথরুম, পার্লার, গ্যারেজ, গার্ডেন ইত্যাদি নামের কক্ষ এবং চত্বর। ঘরের আসবাবপত্রের মধ্যে রয়েছে: পালঙ্ক, আলমারি, ওয়ারড্রোব, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, টেবিল ল্যাম্প, বুকশেলফ, সোকেস, মিডশেফ, ট্রাংক, ইলেক্ট্রনিক ফ্যান, হিটার, ট্রিপয়, টেলিফোন, টেলিভিশন, রিফ্রিজারেটর, স্ক্রিন, ফরাস, জাজিম, গ্লাস, প্লেট, কাপ, স্পুন, প্যান, কুকার, ব্রাস, বোতাল ইত্যাদি। এগুলিকে আধুনিক নগরসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান বলা যেতে পারে। এতে জাঁকজমক, চাকচিক্য ও আভিজাত্যের চিহ্ন দেখা যায়। ঘরের বাইরে রয়েছে স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, দোকানপাট, সিনেমা, থিয়েটার, মিল-ফ্যাক্টরি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্লাব, পার্ক, স্টেডিয়াম, জিমনেসিয়াম, সুইমিংপুল, এয়ারপোর্ট, নদী বা সমুদ্রবন্দর, বাস-ট্রাক-ক্যাব ইত্যাদি। এসব মিলেমিশে একটা যান্ত্রিক, ব্যস্ত, কর্মমুখর, ভোগসর্বস্ব, কৃত্রিম জীবনধারার সাংস্কৃতিক রূপ ফুটে উঠেছে।
অপরদিকে লোকসংস্কৃতি বা গ্রামীণ সংস্কৃতি কিছুটা রক্ষণশীল। গ্রামবাসী তাদের অভ্যস্ত জীবনধারা সহজে ত্যাগ করতে চায় না, হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তারা অাঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাইরের জগতের যোগাযোগ কিছুটা কম। কৃষিনির্ভর স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনে তা আরও কম। ফলে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব এতে বেশি পড়ে না। ফলে তাদের সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে খানিকটা ধীর গতিতে। পল্লীর নিভৃত শান্ত প্রকৃতির কোলে গ্রামবাসীর না আছে উচ্চ দালান, না আছে চকচকে আসবাবপত্র। গ্রামীণ সংস্কৃতির উপাদানগুলোকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। যেমন দেউড়ি, শোয়ারঘর, হেঁসেল, বৈঠকঘর বা কাচারি, গোলাঘর, গোয়ালঘর, উঠান এগুলি নিয়ে পল্লীর একেকটি পারিবারিক ঘরের পরিচয়। ঘরের মাটির দেওয়াল, খড়ের ছাউনি, খড়ের বেড়া। অতি সাধারণ তৈজসপত্রের মধ্যে রয়েছে: খাট, চকি, কাঁথা, কাঠের বাঙ্, তোরঙ্গ, মাটি বা সিলভারের হাঁড়িপাতিল, কাঁসা, চিনামাটি, মেলামাইন, কাচ বা প্লাস্টিকের থালাবাসন, শিকা, পাটি, মোড়া, পিঁড়ি, খুন্তি, দা-বটি, ছুরি, কোদাল, কুড়াল ইত্যাদি। চাষীর ঘরে আছে লাঙ্গল, জোয়াল, মই, দড়ি, পাঁচনি, দাউলি, হেঁসে, কাস্তে প্রভৃতি। জেলের আছে বিচিত্র জাল, বানা, হোঁচা, কোঁচ, পলই, ছিপ ইত্যাদি। আরো আছে নৌকা, হাল, পাল, মাস্তুল, দাঁড়, সেঁউতি, নোঙর, লগি ইত্যাদি। জোলা বা তাঁতির আছে তাঁত, মাকু, চরকা, তবি প্রভৃতি। কামারের আছে হাফর, হাতুড়ি। কুমারের আছে চাকা, ছিলকা। ছুতারের আছে নিহান, বাটালি, করাত, রেঁদা প্রভৃতি। এ শ্রেণীর মানুষদের নিয়েই গ্রামবাংলার সমাজ এবং এগুলোই হলো সেই সমাজের সাংস্কৃতিক উপাদান। এসব নিয়ে তাদের আবহমান কর্মজীবন চলছে। তাদের ছেলেমেয়েরা উঠানে বা রাস্তায় খেলা করে। মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনি শোনা যায়, মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যায় ঘণ্টা বাজে। মুসলমানরা নামাজ, দোয়া-দরুদ পড়ে, হিন্দুরা প্রতিমাপূজা ও প্রণাম করে। প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌহার্দ্য-সমপ্রীতিতে বসবাসের মধ্যে বাংলাদেশের পল্লীবাসীর সহজ-সরল জীবনপ্রবাহ প্রাচীনকাল থেকে খানিকটা রূপ-রূপান্তরের ভিতর দিয়ে চলে আসছে। বাংলাদেশের লোকজীবন থাকলে তার বৈচিত্র্যপূর্ণ এসব লোকসংস্কৃতিও থাকবে।
এদিকে আদিম সংস্কৃতি বা আদিবাসীদের সংস্কৃতি পুরোমাত্রায় রক্ষণশীল ও সনাতনপন্থী। বাইরের জগতের সঙ্গে আদিবাসী জীবনের সম্পর্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন। তারা নিজ নিজ ধর্ম, আচার, বিশ্বাস এবং জীবনরীতিতে শ্রদ্ধাশীল ও নিষ্ঠাবান। তাদের জীবিকা চাষ, শিকার এবং ফলমূল সংগ্রহ। তারা আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞানের বাইরে আদিম বা পুরনো বা সাবেকী জীবনসাধনায় রত। আদিবাসীরা পূর্বপুরুষের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে বহন করে চলেছে। গ্রহণ-বর্জনের রীতি না থাকায় আদিবাসী সংস্কৃতির তেমন কোনো বিকাশ ও বিস্তার ঘটছে না। চাকমা, মুরং, টিপরা, গারো, খাসিয়া প্রভৃতি আদিবাসী জুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সাঁওতাল, ওরাঁও গোষ্ঠীর লোকেরা চাষ ও শিকার উভয় প্রকারে খাদ্য সংগ্রহ করে।
মোটাদাগে বাংলাদেশের সংস্কৃতির তিনটি ধারা হলেও এই তিন ধারার মধ্যেও আমরা নানা ধারা-উপধারা, নানা বৈচিত্র্য দেখতে পাই। যেমন বাঙালি সংস্কৃতির কথাই ধরা যাক। বলা হয়ে থাকে, বাঙালি সংস্কৃতি এক ও অভিন্ন। আসলে কি তাই? ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের অধিবাসী সকল বাঙালির সংস্কৃতি কি এক ও অভিন্ন? নাকি এর ভেতরেও রয়েছে নানা ধরণ, নানা বৈচিত্র্য? আপাতদৃষ্টিতে এক মনে হলেও বৈচিত্র্য অবশ্যই রয়েছে। সেই সূক্ষ্নতম বৈচিত্র্যগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে ভাষা, পোশাক-আশাক, ঐতিহ্য এমনকি নীতি-নৈতিকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে লেখা যেতে পারে ভাষা বৈচিত্র্য প্রসঙ্গে। ভাষা সংস্কৃতিরই অংশ। বাঙালি বাংলা ভাষায় কথা বলেও এটা জানা কথা। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশের বাংলা ভাষার চেহারা কি এক? নাকি এক ভাষার বহু চেহারা, বহু রকম, বহু ধরণ, বহু বৈচিত্র্য রয়েছে? না, বাংলাদেশের অধিবাসী সকল বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির ভাষার চেহারা এক নয়। নিশ্চয়ই বৈচিত্র্য রয়েছে। যেমন চট্টগ্রামী বাংলা ও ঢাকাই বাংলার মধ্যে ফারাক রয়েছে। বরিশালের বাংলা ও খুলনার বাংলায়, রাজশাহীর বাংলা ও রংপুরের বাংলায়, নোয়াখালীর বাংলা ও কুমিল্লার বাংলায়, সিলেটের বাংলা ও ময়মনসিংহের বাংলায় বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। উদাহরণ: ঢাকাই বাঙালিরা ‘আমি’ শব্দটিকে আমি, ‘তুমি’কে তুমি, ‘তোমার’কে তোমারই বলে। অপরদিকে চট্টগ্রামের বাঙালিরা বলে ‘আঁই’, ‘তুঁই’, ‘তোঁয়ার’। ভাষার এই বৈচিত্র্য দেশের তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ, পাথুরিয়া থেকে রূপসা সর্বত্রই বিস্তৃত।
আবার একই জেলার একই ভাষাভাষী মানুষের মধ্যেও ভাষাগত পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে ফেনী জেলার কথা ধরা যাক। ফেনীর উত্তরাঞ্চলের মানুষ ‘আমাদের’ শব্দটিকে বলে ‘আণ্ডা’, ‘তোমাদের’ শব্দটিকে বলে ‘তোণ্ডা’। আবার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ একই শব্দকে বলে ‘আঙ্গো’ এবং ‘তোঙ্গ’। একই জেলার একই ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে এরকম বহু শব্দগত বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়। আবার জেলার উত্তরের মানুষ যে সুরে, যে টানে কথা বলে, দক্ষিণের মানুষ ঠিক একই সুরে, একই টানে কথা বলে না। ভাষাভঙ্গিমা বা কথা বলার ধরণের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করার মতো। ফেনীর উত্তরাঞ্জলের মানুষ কথা বলে দ্রুত, কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ভাষাকে একটু রসিয়ে-তরিয়ে ধীর গতিতে বলে।
বাংলাদেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতির হাজার হাজার উপকরণ রয়েছে। আবার সেই উপকরণগুলো নানা বৈচিত্র্যও রয়েছে। সেসব বৈচিত্র্যের কথা স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করবার মতো নয়। একটি সমাজের বিচিত্র মানুষের আত্মিক ও বস্তুতান্ত্রিক তারতম্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, তাদের চিন্তা-চেতনা, তাদের অনুভূতিগত বৈচিত্র্য ইত্যাদি সবকিছুর সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনযাপন পদ্ধতি, জীবনের বিচিত্র অবস্থা, মানুষের মানবিক অধিকার, তাদের মূল্যবোধের ধারা, তাদের আবহমান ঐতিহ্য ও বিশ্বাস ইত্যাদি। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি বাংলাদেশের মানুষকে বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ জীবন দান করে, বিবেচনা শক্তি দেয় এবং মানুষের মাঝে নৈতিকতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। সংস্কৃতির এই বৈচিত্র্যের মাধ্যমে আমরা মূল্যবোধের শিক্ষা পাই এবং নিজেকে অন্যদের মাঝে পরিচিত করে তোলার সুযোগ পাই কিংবা নিজেদের মধ্যকার সীমাবদ্ধতাগুলোকে অতিক্রম করার সুযোগ পাই। সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে হবে আমাদের। আমি যে সংস্কৃতি লালন করি বা চর্চা করি সেটা ভালো, অন্যের সংস্কৃতি মন্দ, সেই মন্দ সংস্কৃতিকে উৎখাত করতে হবে এমনটি করা যাবে না কিছুতেই। কিংবা আমি বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করি, তার সংস্কৃতি আদিম, এই আদিম সংস্কৃতিকে হটাতে হবে এমন মনোভাব পোষণ করা অন্যায়। কারণ সংস্কৃতির বৈচিত্র্য না থাকলে আমাদের মধ্যে একঘেঁয়েমি আসতে বাধ্য। সংস্কৃতির এই বহুত্ব আমাদেরকে আনন্দ দেয়, সুখী রাখে। প্রত্যেক সংস্কৃতি আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। কারো পক্ষেই সম্ভব নয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে বিভিন্ন সংস্কৃতির ভূমিকাকে গোপন রাখে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য মূল্যবান ও বৃহৎ এক সম্পদ। এই সম্পদ কারো বিরক্তি, অসংলগ্নতার কারণ যেমন হওয়া উচিত নয়, তেমনি তাকে প্রত্যাখ্যান করাও উচিত নয়। উল্টো বরং যৌথ সহযোগিতা বিস্তারের উপায় বা হাতিয়ারে পরিণত হওয়া উচিত। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সংহতি, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি এবং বিভেদ বা মতানৈক্য পরিহারের উপায় হওয়া উচিত। বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বায়নের ধ্বংসাত্মক প্রবাহের মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ধন্যবাদ…